
আন্তজার্তিক অপরাধ আইনের দৃষ্টিকোন থেকে বিগত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকান্ডটি ছিল মানবধিকার পরিপন্থী ও মানবতা বিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভয়াবহ গণহত্যাকে অপরাধের অপরাধ ও মানবিক মন্দতার ভয়াবহ প্রতীক হিসেবে বিচেনা করা যেতে পারে।
বিগত ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পযর্ন্ত বাংলাদেশের সর্বত্র মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। অথার্ৎ ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে। এতে দুই হাজারের বেশি লোক শহীদ হয়েছেন। ২৫ থেকে ৫০ হাজারের মতো লোক আহত হয়েছেন। এখানে যারা অপাধগুলো সংঘটিত করেছেন, তাদের সংখ্যাও হাজার হাজার। এই ভয়াবহ কলঙ্কজনক হত্যাকান্ড বিচারের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়মুক্তির জন্য দ্রুত হত্যাকান্ডের বিচার হওয়া অতীব জরুরি। বিশ্বেরবুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য, জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার জন্য জুলাই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া অত্যাবশক।
পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অসংখ্য বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল-২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর হত্যাকান্ড, ২০১৩ সালের ৩ মে মওলানা সাঈদীর প্রশ্নবিদ্ধ রায়ের প্রতিবাদে জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলাচত্বরে হেফাজতের সমাবেশে গণহত্যা, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিবাদ দমনের নামে হত্যাকান্ড, ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই জঙ্গিবাদ দমনের নামে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ী হত্যাকান্ড, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ মিছিলে নির্বিচারে গুলিবাষর্ণসহ আরো অনেক গোপন হত্যাকান্ড।
এছাড়াও ঘটেছে গুমের মতো অনেক ভয়াবহ ঘটনা। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৭০০ লোক গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০০ গুম হওয়া ব্যক্তিকে আর কোনোদিন স্বজনরা হয়তো পাবেন না। গুম করার পর অনেকেই নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। লাশ টুকরো টুকরো করা হয়েছে, বস্তায় ভরে লাশ বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও যমুনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। অনেককে গুম করে সীমান্ত এলাকা ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীর কাছে হস্তান্তর করা হতো। আবার অনেক হতভাগ্যকে আয়নাঘর নামক গোপন বন্দিশালায় আর্ধাহারে-অনাহারে রাতবিরাত বছরের পর বছর অমানসিক নির্যাতন করা হতো। আয়নাঘর ছিল নির্যাতন করার গোপন হাতিয়ার। জুলাই বিপ্লবের পর এই আয়নাঘরের সন্ধান পাওয়া যায়। শুধু ঢাকায়ই নয়, দেশের প্রতিটি জেলায় এমন আয়নাঘর তৈরি করে মানুষকে নির্যাতন করা হতো। প্রতিটি গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে। বিগত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এসব গণহত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুরোধে জাতিসংঘের মানবাধিকার- বিষয়ক হাইকমিশনারের একটি দল বাংলাদেশে এসে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ বিচার-বিশ্লেষন করে নিরপেক্ষভাবে ১১৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদটি তৈরি করার সময় তারা ঘটনাস্থল পরিদশর্ন করেছে, আসামীপক্ষ ও ভিক্টিমের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, অডিও রেকর্ড, ভিডিও ফোটেজ, আলামত ও প্রত্যক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে। এর ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর জেনেভা থেকে ‘বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের গণআন্দোলন-সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ শীর্ষক এক অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ তথ্যানুন্ধান দল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটানার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে খুনী হিসেবে চিহিৃত করা হয়। বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। যারা হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের মধ্যে ১২.১৩ শতাংশ ছিল শিশু। এতে আরো বলা হয়, বিক্ষোভ দমনের কৌশলের অংশ হিসেবে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে এবং সমন্বয় ও নির্দেশনায় শত শত বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চালানো হয়। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ হত্যাযজ্ঞ পরিচালনাকারী দল হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে চিহিৃত হয়েছে।
এ রিপোর্ট প্রকাশের পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে পাঁচটি খাতে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। যেসব খাতে সংস্কারের সুপারিশ করেছে, সেগুলো হলো-জবাবদিহিতা ও বিচারব্যবস্থা ; পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ; নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ; রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সুশাসন ও দুর্নীতি দমন। এছাড়াও জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানানো ও আন্তজার্তিক অপরাধ আদালতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি উত্থাপন করার সুপারিশও করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন প্রকাশের এ খবর গুরুত্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ায়। বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাসহ আমাদের দেশের সব সংবাদ মাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ তদন্ত রিপোর্টের মাধ্যমে জুলাই হত্যাকান্ডে জড়িতরা চিহিৃত হওয়ায় পাশাপাশি তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। জুলাই হত্যাকান্ডে জড়িতদের বিচারের জন্য এ প্রতিবেদন একটি অকাট্য দলিল। গত ৫ মার্চ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৫৫তম অধিবেশনে সংস্থার মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকান টুর্ক বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলের প্রতিবেদন সম্পর্কে সদস্য দেশগুলোকেও ব্রিফ করেছেন।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণহত্যার বিচার সুসম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে বিগত ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গঠিত ‘আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে’ পুর্নগঠন করা হয়েছে। বিচারপতি গোলাম মতুর্জা মজুমদারকে চেয়ারম্যান ও মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে এ ট্যাইব্যুনাল পুনগর্ঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ১৮-১৯টির মতো অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে জমা পড়েছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার সহ হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় দীর্ঘ সাত মাস পরও এখনো পর্যন্ত একটি মামলারও চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করতে পারেনি কোনো তদন্তকারী সংস্থা!! তাই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-জুলাই হত্যাকান্ডের বিচার আদৌ হবে কি?
তবে এ হতাশার মধ্যেও সাধারণ জনগণ জাতিসংঘের এ তদন্ত রিপোর্টে জুলাই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে আশা আলো দেখতে পাচ্ছে। শুধু সুবিধাবাদী ও ক্ষমতা লোভী কতিপয় রাজনৈতিক দল ছাড়া আমজনতা এ রিপোর্ট প্রকাশের জন্য জাতিসংঘকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। কতিপয় রাজনৈতিক দলের এধরনের আচরণকে মানু্ষ সন্দেহের চোখে দেখছেন।
এ রিপোর্ট প্রকাশের পর পর মানবাধিকার কর্মী, গণমাধ্যকর্মী, সচেতন নাগরিকসমাজ, আইন বিশেষজ্ঞ, নিরাপত্তা ও আন্তজার্তিক বিশ্লেষকদের মাঝে জুলাই হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছে, যত দ্রুত সম্ভব জুলাই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, সেজন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে হাসিনাসহ তার সহযোগীরা ভারতে অবস্থান করছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে জাতিসংঘের তদন্ত রিপোর্টে। শেখ হাসিনার বিচারের জন্য অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তজার্তিক উদ্যোগও জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে জনগণের একান্ত চাওয়া প্রকৃত অর্থে দেশের সংস্কার ও আওয়ামীগের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা, তারপর নির্বাচন। আর যারা জুলাই বিপ্লবের হত্যাকারীদের বিচার আর সংস্কার বাদ দিয়ে নির্বাচন চান, তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে জনগণ সন্দিহান! পক্ষান্তরে তারা পতিত ফ্যাসিস্টকেই সমর্থন করছেন। বর্তমানে নানা কারণে অনেকেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ। এরপরও দেশবাসীর চাওয়া সংস্কার ও বিচার না করে তিনি যেন চলে না যান। কারণ এ ধরনের সুযোগ আর জাতির জীবনে কখনো আসবে না।
বস্তুত, জুলাই হত্যাকান্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার আমলের দুঃশাসনের চিত্র ফুটে উঠেছে। এত বড় মাত্রার অপরাধের সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যদি তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে বিশ্বের বুকে জাতি হিসেবে আমরা কোনো দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। সুতরাং সুশাসন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে জুলাই হত্যাকান্ডের মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচার শুরু করতে হবে। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized