বৃহস্পতিবার দুপুর ১:০৬, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ. ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ খবর:
‘আমার স্ত্রী মাকসুদাকে মেরে ফেলেছি, আমাকে থানায় নিয়ে যান’ বন্যার্তদের জন্য জাতীয় সাংবাদিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের আলোচনাসভা ও দোয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া আয়কর আইনজীবী সমিতির অভিষেক ও দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠিত ২৮ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা একাডেমিতে ‘মাতৃভাষা উৎসব’ ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বোর্ড নির্বাচন অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পোস্টারে লেমিনেশন ও পলিথিন ব্যবহাররোধে স্মারকলিপি ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর জাতীয় পার্টি: চুন্নু মাতৃভাষা একাডেমিতে কবিতা আড্ডা অনুষ্ঠিত হোমিওপ্যাথিক হেলথ এন্ড মেডিকেল সোসাইটি ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়া সম্মেলন অনু‌ষ্ঠিত ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়ার বিখ্যাত বাইশমৌজা বাজার ও গরুর হাট ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়ায় তরুণ আলেমদের ২য় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত তরুণ আলেমদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

সেনাবাহিনী, ১/১১ ও বিডিআর দরবার হলের ম্যাসাকার!

১৩১ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

ছাত্র সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ’র সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট খানিকটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিতর্কের বিষয়টি নতুন নয়। পুরনো বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ দেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার তান্ডবের মাধ্যমে। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদ প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে ১/১১ সরকার গঠন করেন। বোদ্ধা মহল মাত্রই অবগত যে, ১/১১ সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে ইন্ডিয়ার হাত ছিল। ইন্ডিয়ার এমন দুঃসাহসের একটা বড় কারণ আছে। ২০০১ সালে সন্ত্রাসী হামলায় নিউইয়র্ক সিটিস্থ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস হয়। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র “War on Terror” অর্থাৎ ”সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” শুরু করে। এ যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইন্ডিয়াকে ঘনিষ্ট মিত্র হিসেবে কাছে টেনে নেয়।

এ সুযোগেই ১/১১ সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে রাইফেল রেখে ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা “র” বাংলাদেশের সব সেক্টরে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। ইন্ডিয়ার প্লান অনুযায়ী সরকার পরিচালিত হতে থাকে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সে অবিশ্বাস্য নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। মূলত সে নির্বাচনের পর থেকেই সেনাবাহিনী নিয়ে নানা সন্দেহ ও অবিশ্বাস দানা বাঁধে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পাবার পর ভিন্নমতাবলম্বী, রাজনৈতিক বিরোধীদের জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছিস। সেনাবাহিনীর সৈনিক ও অফিসাররাও এ দুর্যোগ থেকে মুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর দরবার হলে ৫৭ জন অফিসারকে নৃশংস ভাবে খুন করার সময় নির্লিপ্ত ছিল সেনাবাহিনী।

খুনিরা যখন একে একে সেনা অফিসারকে নির্বিচারে হত্যা করছে তখন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উদ্দিন আহমেদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার যমুনার বাসভবনে বসে সোনারগাঁও হোটেলের বিরিয়ানী খেয়েছেন! একটি বহুল প্রচারিত কথা চালু আছে যে, ইন্ডিয়ান জুজুর ভয় দেখিয়ে বিডিআর দরবার হলের ঘটনায় সেনাবাহিনীকে তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে দেয়া হয়নি। সেনা অভিযান চালানো হলে এতোগুলো অফিসার প্রাণ হারাতেন না। দরবার হলের ঘটনায় সেনাবাহিনীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার পাশাপাশি বিডিআরকেও ধ্বংস করে দেয়া হয়। দরবার হলের ম্যাসাকারের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে ৫৬ জন বিডিআর জওয়ানকে খুন করা হয়। ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অভিনাস পালিওয়াল “Indias near east: A new history.” নামে একটি বই লিখেছেন। এতে বলা হয়েছে, দরবার হলে সেনা হস্তক্ষেপ হলে ইন্ডিয়া বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালাতো। নিচে লিঙ্ক দিলাম। বিস্তারিত পড়ে দেখতে পারেন।

https://rb.gy/hzt88b

সেনাপ্রধান নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনায় “Too add fuel to the fire. অর্থাৎ আগুনে ঘি ঢেলেছেন স্বয়ং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রাওয়া কনভেনশন হলে বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই-এগুলো অতীতে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। খারাপ কাজের সাথে অসংখ্য ভালো কাজ করেছে। এর মধ্যে যদি অপরাধ করে থাকে। সেটার শাস্তি হবে। অবশ্যই শাস্তি হতে হবে। কিন্তু তার আগে মনে রাখতে হবে, আমরা এমন ভাবে কাজটা করব এ সমস্ত অর্গানাইজেশনগুলো যেন আন্ডারমাইন না হয়।’ ২০০৯ সালে পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকান্ড নিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘একটা জিনিস আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, এ বর্বরতা কোনো সেনা সদস্য করেনি। সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিজিবি (বিডিআর) সদস্য দ্বারা সংঘটিত। ফুলস্টপ। এখানে কোনো “ইফ” এবং “বাট” (যদি ও কিন্তু) নাই। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সেনাপ্রধানের পুরো বক্তব্য পড়তে পারেন। নিচে লিঙ্ক দেয়া আছে।

https://shorturl.at/B6oha

সেনাপ্রধানের বক্তব্য শেষ হতে না হতেই সে বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান পিলখানায় নির্মম ঘটনার ভিকটিম ক্যাপ্টেন তানভির হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় যে, ক্যাপ্টেন তানভির হায়দার নূরের লাশটা এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। নূরের স্ত্রী তাসনুভা অভিযোগ করে বলেছেন, অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড (আইএসএসবি)তে অ্যালাও হবার পরও নূরের সন্তানকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়নি। তার বড় অপরাধ তিনি নূরের সন্তান! তাসনুভা আরো বলেছেন, সেদিন পিলখানায় তার বাসায় যাওয়া লোকগুলো হিন্দি ভাষায় কথা বলেছেন। হিন্দি ভাষায় কারা কথা বলে এ প্রশ্নটি যদি বর্তমান সময়ের কোনো শিশুকে করেন-সেও সঠিক জবাব দিতে পারবে। তাসনুভার বক্তব্যের ভিডিও লিঙ্ক দিলাম। চাইলে ভিডিওটি দেখতে পারেন।

https://rb.gy/oyth4q

নুরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা একটি টক-শোতে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সেনাপ্রধানের সাথে কথা বলতে চাইলে বর্তমান রাওয়া সভাপতি মেজর (অব.) আবদুল হক তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছেন। মেজর (অব.) আবদুল হক টক-শোতে অনেক সুন্দর কথা বলেন। তিনি দরবার হলের নির্মম ঘটনার ভিকটিম সেনা অফিসারের স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করলেন কেন বুঝলাম না। তাসনুভা আরো অভিযোগ করে বলেছেন, পিলখানায় হিন্দি ভাষায় কথা বলার বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য তাকে হুমকি দেন হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারেক আহমদ সিদ্দিকীর স্ত্রী শাহিন সিদ্দিকী। যদি প্রকাশ করেন তাহলে তাকে ১০ টাকার রাস্তায় মহিলা বানিয়ে ছাড়বেন বলে হুমকি দেয়া হয়। কি ভয়ঙ্কর অবস্থা চিন্তা করেছেন? মাহার টক-শোর লিঙ্ক দিলাম। দেখতে পারেন।

https://rb.gy/rjjasc

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় যে, সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পরপর দুইবার ড. ইউনুস বলে সম্বোধন করেছেন। একজন সেনাপ্রধান হিসেবে এটা একেবারেই শোভনীয় হয়নি। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার প্রধান। সেনাপ্রধান তার অধীনস্থ একজন কর্মচারী। বাংলাদেশে নোবেল লরিয়েট শুধুমাত্র একজন-তিনি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দুনিয়ার অনেক দেশ ড. ইউনূসের কারণেই বাংলাদেশকে চিনে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টাকে নাম ধরে সম্বোধন করার বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

পিলখানা ম্যাসাকার ছিল দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়ার ২য় প্রজেক্ট। এ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে নিবন্ধের পরিধি বিশাল আকার ধারণ করবে। সামান্য কিছু অংশ তুলে ধরা দরকার। বিডিআর ম্যাসাকার যে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে নিচের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যাবে।

২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জনৈক ইহুদি কার্ল সি ভাক্কো’র যৌথ নামে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সে নিবন্ধে সজিব ওয়াজেদ জয় হাজার হাজার ”ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গি” নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীকে অভিযুক্ত করেন। সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার মধ্য একটি দলের প্রধানের ছেলের এ জাতীয় রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বহির্বিশ্বে দলটির ভাবমূর্তি ও ক্ষমতা লাভের আশাকে ক্ষুন্ন করেছিল।

জয় তার নিবন্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীকে ইসলামী সন্ত্রাসবাদমুক্ত করে পুনর্বিন্যাস করার বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন। যাতে তারা স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছ থেকে জাতিকে উদ্ধারে আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টায় কখনো বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। একটি অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করা যায়। এ নিবন্ধে জয় ইন্ডিয়া-ইসরায়েলকে ব্যক্তিগত নিশ্চয়তা দেন যে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আগামী ২০ বছরে তিনি একজন হিন্দু প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান।

সেনাবাহিনীর প্রতি সর্বজন বিদিত ভীতি ও অবিশ্বাসের পরও ক্ষমতার জন্য মরিয়া শেখ হাসিনা তাদের সমর্থন পান। তবে ’র’ ও মোসাদ বাংলাদেশকে ঘায়েল করতে সেনাবাহিনীকে দূর্বল করতে চেয়েছিল। ১৯৯০ এর দশক থেকেই ‘র’ এ লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। এ সময়কালে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা গোয়েন্দা অফিসার প্রকাশ্যে এ বিষয়ে সেনাবাহিনীকে সতর্ক করেছিলেন। মজার বিষয় হচ্ছে, সেসব সতর্কতায় কান না দিয়ে সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদ ও তার কতিপয় লেফটেন্যান্ট আমাদের শত্রুদের সাথে ধ্বংসলীলায় মেতেছিলেন।

২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ বিডিআর বিদ্রোহের একদিন আগে মহিউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এমপিরা সেনাবাহিনীর তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেন। বিদ্রোহের সময় একদল আওয়ামী কুচক্রি বুদ্ধিজীবী একই ধরণের প্রচারণা চালায়। এর পর তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্ণেল (অব.) ফারুক খান সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।

দরবার হলে গোলযোগ শুরুর সাথে সাথেই সাহায্য চেয়ে একের পর এক ফোন করেন ডিজি, কর্ণেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ, কর্ণেল এমদাদসহ দরবার হলের ভেতর থাকা প্রায় সব কর্মকর্তা। নয়টা ৪৫ মিনিটের দিকে কর্ণেল গুলজার র‌্যাবের ডিজিকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘স্যার, আধঘণ্টার মধ্যে ফোর্স পাঠান। নইলে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে, আমরা নিরস্ত্র।’ মেজর জায়েদী মোবাইল ফোনে মেজর জেনারেল তারেক আহমদ সিদ্দিকীকে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন এবং সাহায্য চান। এরপর জায়েদী মেজর জেনারেল শাকিলের হাতে মোবাইল দেন। বিডিআর ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ তারেক সিদ্দিকীর  সাথে কথা বলেন।

গোলাগুলি বাড়তে থাকলে কর্মকর্তারা পর্দার পেছনে মঞ্চের দুই পাশে আশ্রয় নেন। একপাশে দক্ষিণ দিকে তিন মহিলা কর্মকর্তা এবং লে. কর্ণেল লুৎফর রহমান খান, লে. কর্ণেল রবি, লে. কর্ণেল বদরুল হুদা, মেজর জাহিদসহ আরও কয়েকজন। অন্যপাশে ডিজি, ডিডিজি, লে. কর্ণেল কামরুজ্জামান ও আরও কয়েকজন ছিলেন। মেজর জায়েদী কিছুক্ষণ উত্তর পাশে-পরে দক্ষিণ পাশে অবস্থান করেন। মঞ্চের পর্দার ভেতরে যাবার সময় কর্ণেল আনিস ও লে. কর্ণেল কামরুজ্জামান বেঁধে রাখা সৈনিক মাঈনকে টেনে পর্দার ভেতরে নিয়ে আসেন। এ ছাড়া অনেকে হলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের টয়লেটের দিকে বিভিন্ন আড়ালে আশ্রয় নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কর্ণেল রেজা, কর্ণেল আফতাব, কর্ণেল আরেফিন, কর্ণেল এমদাদ, লে. কর্ণেল সাজ্জাদ, মেজর ইকবাল, মেজর মনির, মেজর মাসুম সহ আরও অনেকে। মেজর সালেহ, মেজর জায়েদী, কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর, নায়েব সুবেদার অ্যাডজুট্যান্ট ও কর্ণেল আনিস (ডিওটি) পর পর মাইকে কথা বলে উত্তেজিত সৈনিকদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, ‘তোমাদের সব দাবি মানা হবে, তোমরা ফায়ার বন্ধ করো।’

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল নয়টা ৪৮ মিনিটের দিকে ডিজি শাকিল আহমেদ ফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। সবাই যার যার মোবাইল ফোনে বাইরে যোগাযোগ করছিলেন। তখন জেনারেল শাকিল প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন বলে সবাই চুপ করে থাকেন। শাকিল বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক আপনার সরকারকে হেয় করার জন্য বিদ্রোহ করেছে। আমি ওদের সাথে নাই। আমরা আপনার সাথে আছি। আপনি আমাদের সাহায্য করুন। আপনি আমাদের  বাঁচান।’ এরপরই ডিজি অন্য কাউকে (সম্ভবত তাঁর স্ত্রী) ফোনে বলেন, ‘ভয় পেয়ো না। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রাখো।’ সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ০৫ নভেম্বর ২০১৩।

অর্থাৎ সেনা অফিসাররা নিজেদের জীবন বিপন্ন হবার সাথে সাথেই প্রশাসনের সর্বস্তরে যোগাযোগ করেছেন। যাতে তাদের জীবন বাঁচানো হয়। সেনাবাহিনীর কোনস্তর থেকেই অফিসারদের জীবন রক্ষার ত্বড়িৎ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সে সময়ের সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদ অফিসারদের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা না করে হাসিনার যমুনার বাসভবনে বসে থাকেন। রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন অনুযায়ী সেনাবাহিনীর নিজস্ব কৌশল ও পরিকল্পনায় জীবন বিপন্ন সেনা অফিসারদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করার কথা। এখানে বেসামরিক প্রশাসন বা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশের জন্য বসে থাকতে হবে কেন?

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ২৫ ফেব্রুয়ারি দরবার অনুষ্ঠানে হাসিনার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি দরবার হলে উপস্থিত হননি। তার মানে তিনি আগে থেকেই জানতেন যে, সেখানে গন্ডগোল হবে। সময় ক্ষেপনের মাধ্যমে পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক সেনা অফিসারদের খতম করার অপেক্ষায় ছিলেন। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সেনাবাহিনীর একদল সৈনিকের হাতে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান খুন হন।

দরবার হলের ম্যাসাকারের জন্য অনেক বিশ্লেষক তৎকালীন ডিজিএফআই ডিজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরকে দায়ী করেছেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসর পর তাকে ডিজিএফআই-এর ডিজি নিয়োগ করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিডিআর হত্যাকান্ড ধামাচাপা দিতে গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করার অভিযোগ আছে। বহু সেনা অফিসারকে চাকুরিচ্যুত করার পেছনে তার হাত আছে। উপরোক্ত কয়েকটি পয়েন্ট উপলব্ধি করলেই স্পষ্টই বুঝা যাবে দরবার হলের ম্যাসাকার পূর্ব পরিকল্পিত। বহুদিন যাবৎ “মাস্টারপ্লান” করে সেনা অফিসারদের খুন করা হয়েছে।

পিলখানার বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার পরই মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে সেনাপ্রধানকে কটুক্তি ও গালাগাল  করেছেন। সেনাপ্রধান পিলখানার ঘটনায় একক ভাবে বিডিআর জওয়ানদের দায়ী করলেন কেন? পিলখানার ঘটনায় জড়িতদের হিন্দি ভাষায় কথা বলার অভিযোগ শুধু ক্যাপ্টেন নূরের স্ত্রী তাসনুভার নয়-আরো অনেকেই করেছেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো: সে সময় ১৮ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের সার্চ এন্ড রেসকিউ টিমের সদস্য ক্যাপ্টেন শাহনাজ জাহান একটি বায়ওনিকুলার পান। তিনি বলেছেন, সে ধরণের বায়ওনিকুলার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে না। ক্যাপ্টেন শাহনাজ জাহান পিলখানায় অফিসারদের জীবন রক্ষায় সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন। এর প্রতিবাদ স্বরূপ তিনি সেনাবাহিনী থেকে ইস্তফা দেন। পিলখানা হত্যাকান্ডকে তিনি সেনাবাহিনীর “অ্যাবসলিউটলি গ্রেট ফেইলার” বলে অভিহিত করেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় যে, পিলখানার নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনার সবগুলো আলামত দ্রুত নষ্ট করে ফেলা হয়। নিচে শাহনাজ জাহানের সাক্ষাৎকারের ভিডিও লিঙ্ক দিলাম। দেখতে পারেন।

https://rb.gy/4do6yi

 

পিলখানা হত্যাকান্ডের পরপর মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম রহস্যজনক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান। ক্যাপ্টেন রাজিবুল হক হিমেলের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এ মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করার জন্য সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন মহল থেকে সতর্ক করা হয় বলে হিমেলের পরিবার অভিযোগ করেছেন। পিলখানা হত্যাকান্ডের পর যেসব অফিসার তাদের কলিগদের নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করেছেন তাদের প্রত্যেককে হাসিনা শাস্তি দিয়েছেন। বলতে গেলে পিলখানা ম্যাসাকারের পর সেনাবাহিনীকে তছনছ করে দেয়া হয়েছিল। জঙ্গি সম্পৃক্ততার ভুয়া অভিযোগ এনে মেজর জিয়াউল হকসহ ৫জন সেনা অফিসারকে ফাঁসানো হয়। জিয়াউল হক এখনো পলাতক। ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ করে মিরপুরে হাতকড়া পরা অবস্থায় পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে ১৬টি গুলি করে মেজর জাহিদুল ইসলামকে নির্মম ভাবে খুন করা হয়। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে খুন হন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্ব মোহাম্মদ রাশেদ খানকে খুন করা হয়। চিন্তা করেছেন, হাসিনার আমলে দেশে কেমন ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল? সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অনেক অফিসার আমাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন।

হাসিনার আমলে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকে ব্যাপক অপব্যবহার দেশের ইতিহাসে বিরল। এ সংস্থাকে দিয়ে ব্যাংক ও মিডিয়া দখল করা হয়েছে। নাগরিকদের গুম করা হয়েছে। নাগরিকদের গুমের পর আয়নাঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আয়নাঘর ছিল জার্মানীর একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের বন্দিশালা থেকেও ভয়ঙ্কর। বিএমএ লং কোর্সে সোর্ড অফ অনার পদক পাওয়া অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে গুম করা হয়। একই কায়দায় গুম করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বীর প্রতিক খেতাব পাওয়া লেফটেন্যান্ট কর্ণেল হাসিনুর রহমানকে। হাসিনুর রহমান বলেছেন, ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর সাথে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় তাকে গুম করা হয়েছিল। কি ভয়ঙ্কর ঘটনা! আযমীকে ৮ বছর ও হাসিনুর রহমানকে ১৮ মাস আয়নাঘরে বন্দি রাখা হয়। অর্থাৎ হাসিনার অনুগত কতিপয় জেনারেল তাদের কলিগদের গোশত খেয়েছেন।

ব্যারিস্টার আহমদ বিন আরমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ ১ হাজারের বেশি নাগরিককে গুম করা হয়। ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ আরো অনেকে এখনো নিখোঁজ। এসব জঘন্য ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ৫ অগাস্ট হাসিনা পালানোর পর ৬২৬ জন খুনি আওয়ামী লীগ নেতাদের ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় দেয়া হয়। অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে, আওয়ামী লীগ নেতারা ক্যান্টনমেন্ট থেকে  নিরাপদে দেশত্যাগ করেছেন। অতীতে দেশটা বহু ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করেছে। কোনো নেতাকে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিতে হয়নি। ধরে নিলাম আওয়ামী নেতাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য সেনাবাহিনী তাদের আশ্রয় দিয়েছে। প্রাণ বাঁচানোর পর তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়া উচিত ছিল।

বিগত ১৬ বছর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হাসিনার পতনের পর নির্যাতিতদের মধ্যে আমরা প্রতিশোধমূলক কোনো হিংস্রতা দেখিনি। এ বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসনীয়। আওয়ামী নেতাদের ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষ মোটেও ভাল চোঁখে দেখেনি। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবুর রহমান নজরবন্দি অবস্থায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালালেন কিভাবে? সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত আটক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে বিদেশ পালালেন কিভাবে? এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভ আছে। সেনাপ্রধান তার সেদিনের বক্তব্যে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে বলে সবাইকে সতর্ক করেছেন। আমাদের সার্বভৌমত্বের হুমকি অন্য কোন দেশ থেকে আসবে না এটা নিশ্চিত। যদি কখনো আসে ইন্ডিয়া থেকেই আসবে। এখানেও সেনাপ্রধান ইন্ডিয়া জুজু’র ভয় দেখিয়েছেন বলে মনে হয়।

ইন্ডিয়া জুজুর ভয় দেখিয়ে জেনারেল মইন উদ্দিন আহমেদ ৫৭ সেনা অফিসারের জীবন রক্ষায় পিলখানায় তাৎক্ষণিক সেনা অভিযান চালাননি। ইন্ডিয়াকে এতো ভয় করলে আমাদের সেনাবাহিনী, মিলিটারি একাডেমি, ডিফেন্স কলেজ এবং এতোগুলো ক্যান্টনমেন্ট রেখে লাভ কি? সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে ডিজিএফআই ও এনএসআইকে আন্ডারমাইন না করার কথা বলেছেন। সেনাবাহিনীর সকল অফিসার অপরাধ করেননি। যারা অপরাধ করেছেন তাদের সংখ্যা শতকরা ৫জনও হবে না। অপরাধীদের নিয়ে আলোচনা করলে-তাদের বিচারের কথা বললে প্রতিষ্ঠান কেন আন্ডারমাইন হবে? সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকে একটি মাফিয়া বাহিনীতে রূপান্তর করার মাস্টারমাইন ছিলেন হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারেক আহমদ সিদ্দিকী। তাকে পালানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বিগত ২০০৭ থেকে সেনাবাহিনীর প্রতি গণমানুষের ব্যাপক সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরী হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করেছে কতিপয় জেনারেল। পুরো বাহিনী এর জন্য দায়ী নয়। সেনাবাহিনীর প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহের প্রধান কারণ: ১। সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ১/১১ ঘটানো। ২। পিলখানায় অফিসারদের জীবন রক্ষায় ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারদের নির্লিপ্ততা। ৩। পর পর ৩টি বিনা ভোটের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন। বাংলাদেশকে কক্ষচ্যূত করার প্রথম প্রজেক্ট ছিল ১/১১ এবং ২য়টি ছিল বিডিআর দরবার হলে সেনা অফিসারদের নৃসংশ হত্যাকান্ড। বিশ্লেষকরা বলেছেন, হাসিনাকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখার জন্য দরবার হলের নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছিল।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে সেনাপ্রধানকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ ও গালাগাল করছেন। এটা শোভনীয় নয়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এটা সমর্থন করি না। সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ‘র অভিযোগের পর আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ কড়া ভাষায় সেনাবাহিনীর সমোলোচনা করেছেন। তিনি হয়তো মনের ক্ষোভ থেকেই এটা করেছেন। সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করার পেছনের কারণগুলো আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। বিডিআর দরবার হলের নৃসংশ হত্যাকান্ড নিয়ে সেনাপ্রধানের মন্তব্য করা উচিত হয়নি। এ হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্তের জন্য সরকার ইতিমধ্যে মেজর জেনারেল (অব.)  আ.ল.ম ফজলুর রহমানকে প্রধান করে একটি কমিশন গঠন করেছে।

গুমের ঘটনাগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও কয়েকটি গুমের ঘটনা ঘটেছে। সিনেমাটোগ্রাফার ও লেখক জহির রায়হান গুমের ঘটনা এর অন্যতম। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিব সরকারের পতনের পর দেশে আর গুমের ঘটনা ঘটেনি। ২০১০ সাল থেকে গুমের ঘটনা পুনরায় শুরু হয়। অতীতের এসব জঘন্য অপরাধের জন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর অনেক দায়ভার আছে। এ অধম সহ আরো বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক ১/১১ সরকারের আমলে সেনাবাহিনীর নানা সমস্যা সম্পর্কে সংবাদপত্রে অনেক লেখালেখি করেছেন। তখন সোশ্যাল মিডিয়া বলতে কিছুই ছিল না। ইন্টারনেট সংযোগ  সহজলভ্য ছিল না। সংবাদপত্রে কলাম লেখকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা।

২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ছয়দিনের সফরে ইন্ডিয়া যান বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উদ্দিন আহমেদ। ওই সফরে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রটোকল দেয়া হয়। সে সাথে জার্মান হ্যানোভারিয়ান জাতের ছয়টি ঘোড়া উপহার দেয়া হয়। এ সফরে মইন উদ্দিন আহমেদের সাথে ইন্ডিয়ার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং দেশটির সেনাপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বৈঠক হয়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও মইন উদ্দিন আহমেদের চাকরির নিশ্চয়তাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওঠে আসে।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, সে সফরে ইন্ডিয়ান সেনাপ্রধান দীপক কুমার সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদকে ছয়টি ঘোড়া উপহার দেন। ঘোড়াগুলোর মূল্য ভারতীয় মুদ্রায় ৩৫ মিলিয়ন রুপির কিছু বেশি। বাংলাদেশের সীমান্তে যেসব অ্যান্টি ইন্ডিয়ান বিচ্ছিন্নতাবাদী রয়েছে তাদের সহযোগিতা না করার জন্য ইন্ডিয়ান সেনাপ্রধান সন্তুষ্ট হয়ে এসব ঘোড়া উপহার দেয়া হয়।’ উপহার দেয়া ঘোড়াগুলোর মধ্যে দুটি ঘোটক আর চারটি ঘোটকী। সফরের কয়েকদিন আগেই এ ঘোড়া উপহারের বিষয়ে ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল নারায়ণ মোহন্তি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘোড়াগুলো উপহার দেয়া হয়।’

এরপর ইন্ডিয়ার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ২০০৯ সালে প্রি-প্লানড নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। যদিওবা ছাত্র-জনতার সফল গণবিপ্লবে ৫ অগাস্ট দেশটা রাহুমুক্ত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ’র অভিযোগ সম্পর্কে এটুকু বলতে হয় যে, নির্বাচনে কোন দল কত আসন পাবে সেটা নির্ধারণ করার একমাত্র অধিকার দেশের ভোটারদের। সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর নয়। সেনাবাহিনী দেশের হৃদপিন্ড। এ দেশের সাধারণ মানুষ দেশপ্রেমিক। সেনাবাহিনীর প্রতি তাদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আছে। হাসিনা তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য টাকা-পয়সা, গাড়ী-বাড়ী ও নারীর লোভ দেখিয়ে সেনাবাহিনীর কতিপয় জেনারেলকে পিশাচ বানিয়েছিল। সে পিশাচরাই সেনাবাহিনীকে কলুষিত ও কলঙ্কিত করেছেন। তাই  সেনাবাহিনীর উচিত হবে ব্যক্তির অপরাধের ন্যূনতম দায়ভার গ্রহণ না করা।

লক্ষ্যণীয় যে, বর্তমানে একটি মহল সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের চাটুকারী-তোষামোদী করে যাচ্ছেন। সালাতে সেনাপ্রধানের ইমামতি করা নিয়ে অনেকে তাকে মহামানব বানানোর চেষ্টা করছেন। ইমামতি করা খুব সাধারণ একটা বিষয়। কুরআনের কয়েকটি সাধারণ আয়াত ও সূরা মুখস্থ করতে পারলেই ইমামতি করা যায়। শুধু ব্যক্তির কনফিডেন্স দরকার হয়। নিজেদের গুরুত্ব হারিয়ে যাবার ভয়ে মুল্লা-মৌলভীরা সাধারণ মানুষকে ইমামতি করার জন্য উৎসাহিত করেন না। চাটুকার-তোষামোদকারী সবকালেই থাকে। এখনো আছে। মানুষের মূল্যায়ন হয় তার কর্মগুণে। চাটুকারী-তোষামোদী দিয়ে নয়।

সেনাবাহিনীতে অতীতে ঘটে যাওয়া বেদনাদায়ক ও বিয়োগান্তক ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শাস্তি হওয়া দরকার। বিডিআর দরবার হলের নৃশংস হত্যাকান্ডের ন্যায় বিচার হওয়া জরুরি। এ বিচার বিলম্ব হলে দেশকে সঠিক ট্র্যাকে ফেরানো কঠিন হবে। বিস্ময়কর বিষয় যে, সেনাবাহিনীর ক্ষতিগ্রস্ত অফিসারদের পরিবার-পরিজন বিচারের দাবিতে সোচ্চার হলে তাদের বিভক্ত করার অশুভ তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানেও সেটা স্পষ্ট।

ঢাকা ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ড. এম শহিদুজ্জামান একটি টক-শোতে বলেছেন, ২০০৭ থেকে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের মনে যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরী হয়েছিল সেটা নিরসন করা দরকার। হাসিনার আমলে যেসব মেধাবী অফিসারকে বরখাস্ত ও ভুয়া অভিযোগ এনে চাকরীচ্যূত করা হয়েছে তাদের ক্ষতিপুরণ দেয়ার কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এটাও একটা জরুরি কাজ।

পরিশেষে এটুকু বলতে হয় যে, পদাধিকার বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে। যারা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীকে কলুষিত করেছেন-জনগণের আস্থা ফেরাতে তাদের যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার অনেক দায়িত্ব আছে।

লেখক: গল্পকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

E-mail: s.iquram03@gmail.com

Some text

ক্যাটাগরি: blog, Uncategorized

Leave a Reply

সেনাবাহিনী, ১/১১ ও বিডিআর দরবার…