
সময় বয়ে যায়, নতুন নতুন বছর আসে, সেই সাথে আসে খুশির ঈদ। তবে ঈদের খুশি যতই বদলে যাক না কেন, ছেলেবেলার ঈদের স্মৃতি আজও আমাকে আনন্দ দেয়। শৈশবের দিনগুলো যেমন মধুময়, তেমনি ঈদও আনন্দময়। শৈশবের ঈদের আনন্দ থেকে খুঁজে পাওয়া যায় ঈদের অর্থ। জীবনের এ চলার পথে মাঝেমধ্যে হাতছানি দেয় শৈশবের সেই নিখাদ ঈদ-আনন্দ।
উল্লেখ্য, আমার বাবা মোহাম্মদ শমসের খান সাহেব তৎকালীন সময়ে রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা ঘুরেছি ও পাশাপাশি ঈদ উৎসবও পালন করেছি। আমি সেই ১৯৭০ সালের কথা বলছি। আমরা তখন সপরিবারে ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালী রেলওয়ে কলোনীতে থাকতাম। আমাদের বাসা ছিল রেলওয়ে শম্ভুগঞ্জ ব্রিজের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে। আমাদের বাসার পাশেই ছিল মসজিদ। রমজান মাসে প্রতিদিনই এক এক বাসা থেকে মসজিদে ইফতার দেওয়া হতো। মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে ইফতার করতে মসজিদে যেতাম। বন্ধুদের সাথে ইফতারের আনন্দ বলে বোঝানোর মতো নয়। বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন-ইকবাল, এনামুল, সাদেক, ফিরোজ, বখতিয়ার, মশিউর, মান্নান, জুয়েল, বাবু, প্লাবনসহ আরো অনেকে। তখন আমরা সবাই কেওয়াটখালী রেলওয়ে সরকারি হাই স্কুলে প্রাথমিকে পড়াশুনা করতাম।
ওই সময় ২০ রমজানের পর থেকেই ঈদের আমেজ তৈরি হতো। আমরা ছোট-বড় সবাই রোজা ঈদে নতুন কাপড়ের জন্য মুখীয়ে থাকতাম। ২০-২১ রমজানের দিকে আব্বা সময় করে আমাদের সবাইকে কাপড় কেনার জন্য মার্কেটে নিয়ে যেতেন এবং আমাদেরকে পছন্দের কাপড়টি কিনে দিতেন। তখন এখনকার মতো রেডিমেট পোশাকের তেমন প্রচলন ছিল না। মেয়েরা নিজেদের কাপড় নিজেরাই সেলাই করতেন আর ছেলেদের কাপড় দর্জীর দোকান থেকে সেলাই করা হতো। তখন নতুন পোশাক সবার থেকে লুকিয়ে রাখা ছিল শৈশবের ঈদ-আনন্দের একটি অংশ। ঈদের পোশাক দর্জীর দোকান থেকে আনার পর ট্রাংক বা সিন্দুকে যত্ন করে লুকিয়ে রাখতাম। অনেকে নতুন জামা দেখতে চাইলেও কিছুতেই রাজি হতাম না ঈদের আগে নতুন জামা দেখাতে।
আমাদের সময় বন্ধুদের মাঝে ঈদকার্ড বিতরন ছিল, ঈদের অন্যতম আনন্দ। ২০ রমজানের পর আমরা ঈদকার্ড কিনতাম। সেগুলোতে ঈদ সম্পর্কিত বিভিন্ন ছন্দ লিখে বন্ধুদের দিতাম। দেখা যেত, এত আগ্রহ করে দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও ২/৩ জন ছাড়া আর কেউই আসতো না। তখন তীব্র অভিমানে কিছু দিন তাদের সাথে বলাও বন্ধ রাখতাম। তবে স্কুল খোলার পর পরই সেই অভিমান দূর হয়ে যতো। আজকাল তো ঈতকার্ডের প্রচলন একেবারেই ওঠেগেছে।
ঈদের চাঁদ দেখার মধ্যে ছিল এক অন্য রকম প্রতিযোগীতা। কে সবার আগে চাঁদ দেখবে, তা নিয়ে চলত প্রতিযোগীতা। রোজা ২৯ টা হবে না ৩০-এ নিয়ে চলতো নানা জল্পনা-কল্পনা। বিশেষ করে আমাদের মতো শিশুকিশোরদের মধ্যেও এই আলোচনা হতো। আমাদের বাসার দক্ষিণদিকে ছিল রেলওয়ে ক্লাবঘর আর এর লাগোয়া ছিল একটি লেখার মাঠ, সেখানে চাঁদ দেখা যেত। ২৯ রোজার ইফতারের পর পরই আমরা ছোটরা ভোঁ-দৌড় দিতাম ঈদের নতুন চাঁদ দেখার জন্য। সবার আগে চাঁদ দেখে সেই চাঁদ অন্যকে দেখানোর মধ্যে ছিল স্বর্গীয় আনন্দ। তবে মাঝেমধ্যে আকাশ মেঘাছন্ন থাকলে ঈদের চাঁদ দেখা যেতো না আকাশে।
এঅবস্থায় ঈদের চাঁদ দেখার আগ্রহ নিয়ে ঢাকা-ভৈরব রেললাইনের কাছে চলে যেতাম। জায়গাটি সমভূমি থেকে ৫০-৬০ ফুট উঁচু হবে। অনেক প্রচেষ্টার পর এক চিলতে চিকন চাঁদ নজরে পড়ত, মুহুর্তে মিলিয়ে যেত। ফের খুঁজে পেলে আঙুল ঘুরিয়ে চিৎকার করে অন্যদের দেখাতাম। চাঁদ দেখার পর খুশিতে নাচতে নাচতে এক দৌড়ে চলে আসতাম বাসায়। শিশুকিশোর ও আশপাশ এলাকার বয়স্কদের কাছ থেকে চাঁদ দেখার খবরটি নিশ্চিত হওয়ার পর পরই মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা আসতো-আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর, ‘ঈদ মোবারক’, ‘ঈদ মোবারক’। পাশাপাশি লাকোশেড থেকেও সাইরেন বাজানো হতো।
চাঁনরাতে হাতে মেহেদি লাগানো ও আতশবাজি ফুঁটানোর ব্যাপক প্রচলন ছিল। আমার বড় বোন নাদিরা বেগম ছিলেন নকশা করে মেহেদি দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ। তার সমবয়সীদের মধ্যে ছিলেন-পারভিন হোসেন মালকা, বশির সুলতানা, মুন্নি বেগম, জাহানারা খাতুন, রুবি আক্তারসহ আরো অনেকে। তারা সবাই আমাদের বাসায় আসতেন হাতে মেহেদি দেওয়ার জন্য। বাসায় ভাইদের মধ্যে আমি ছিলাম সবার ছোট। তাই হাতে মেহেদি দেওয়ার আবদার বড় আপুরা মেনেও নিত। আমি একটু অধৈর্য ছিলাম। কতক্ষণ পরপর আঙুল থেকে মেহেদি পাতার পেস্ট সরিয়ে দেখতাম-হাত লাল হচ্ছে কি না। এতে মেহেদির নকশা আমার হাতে পরিস্কারভাবে ফুঁটে ওঠত না। হাত ধোয়ার পর অন্যদের সঙ্গে যখন মিলিয়ে দেখতাম তখন মন খারাপ লাগত।
এঅবস্থায় মন হাল্কা করার জন্য আম্মা আমাকে ২০-২৫ পয়সার মত বকশিশ দিতেন। এই পয়সা পেয়ে মহাখুশি হয়ে দৌড় দিতাম আতশবাজির দোকানে। ওখান থেকে নানা ধরনের আতশবাজি কিনে বন্ধুদেরকে নিয়ে চলে যেতাম ব্রহ্মপুত্র নদীর পারে আর মনের আনন্দে আতশবাজি ফুঁটাতাম। এসময় কলোনীর অলিগলিতে কাবুলিওয়ালাদের মশলাপাতি বিক্রির ধুম পরে যেত। কাবুলিওয়ালাদের কাছ থেকে মুফতে কিশমিশ,কাঠবাদাম ও পেস্তাবাদাম পেতাম। বিভিন্ন ঘরে থেকে তখন সুস্বাদু খাবারে গন্ধ বের হতো। অতঃপর আমরা একটি শক্ত কাগজ কেটে চুঙার মতো করে মাইক বানিয়ে নিতাম। উক্ত চুঙা দিয়ে ইসালামি গজল গেয়ে পুরো কলোনীতে কয়েকটি চক্ক দিতাম। এতে অবশ্য কলোনীর কেউ বিরক্ত হতেন না। এভাবে গান গেয়ে আমরা বেশ আনন্দ পেতাম।
চাঁনরাতে নাপিতের দোকানে কাস্টমারের লম্বা লাইন থাকত, কোন সিরিয়াল পাওয়া যেত না। এসময় শত ব্যস্ততার মধ্যেও আব্বা আমাদের সবাইকে চুল কাটার জন্য নাপিতের দোকানে নিয়ে যেতেন। চুট কাটার ক্ষেত্রে ছোটদেরকে আব্বার ইচ্ছা অনুযায়ী কাদমছাট চুল কাটতে হতো।
উল্লেখ্য, সন্ধ্যায় ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে বাসাবাড়িতে নানা জাতের পিঠা ও মিঠাই বানানোর ধুম পরে যেতো। আম্মাও একাজে ব্যস্ত হয়ে পরতেন। এদিকে বান্ধবীদের হাতে মেহেদী লাগানোর ফাঁকে ফাঁকে বড় আপা আম্মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতেন। আমরা ছোটরা ঘুমানোর আগেই কিছু খেয়ে নিতাম। তারপর বিছানায় যেতাম। কিন্তু ঈদের খুশিতে ও উত্তেজনায় চোখে ঘুম আসতেই চাইত না।
ফজরের আজানের আগেই বিছানা থেকে উঠে যেতাম। অতঃপর মহল্লার বন্ধুদের সাথে নিয়ে দলবেঁধে গোসল করতে বাসার পূর্ব পাশে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র নদীতে চলে যেতাম। তখন সারা বছরই ব্রহ্মপুত্র নদী পানিতে টইটম্বুর থাকতো। নদীতে ডলফিন বা শুশক দেখা যেত। ‘নূর নবী মক্কার পানি ঈদের গোসল করলাম আমি’, এই শ্লোক জপ করতে করতে ১০-১২ টি ডু্ব দিতাম। নদীর টলটলে পানিতে বন্ধুদের সাথে লাই খেলা খেলে ও সুগন্ধী সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল সেরে বাসায় ফিরতাম।
অতঃপর ঈদগাহে যাওয়ার জন্য নতুন জামা পরে ও আতর মেখে প্রস্তুত হয়ে খেতে বসতাম। খাবার সেরে রওয়ানা হতাম ঈদগাহের উদ্দেশে। রাস্তার উভয় পাশে গরীব লোকরা সাহায্য পাওয়া আশা লাই ধরে বাসে থাকতেন। আব্বা তাদেরকে যাকাত ও ফেতরার টাকা প্রদান করতেন। আমরা তাকবির বলতে বলতে ঈদগাহের দিকে যেতাম।
তখনকার সময়ে কেওয়াটখালীর মরাখোলা মাঠে ঈদের নামাজের অন্যতম জামায়াত অনুষ্ঠিত হতো। আমরা ছোটরা দলবেঁধে প্রত্যেকে তাদের বাবাদের সাথে ঈদগাহে যেতাম। ঈদগাহে যেতে যেতে একে অন্যের পোশাক দেখা হতো। আলোচনা হতো কার পোশাকটি আনকমন! ঈদগাহে পৌঁছার ১৫-২০ মিটিন পরই ঈদের নামাজ শুরু হয়ে যেত। অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করতে গিয়ে আমরা ছোটরা ভুল করে ফেলতাম! নামাজ শেষে বন্ধুদের সাথে কোলাকুলি করতাম আর মুরুব্বিদের পা ছুয়ে সালাম করতাম। এই কোলাকুলির মাধ্যমের ছোট-বড় সকলের মধ্যেকার মনোমালিন্য ও ভুল বোঝাবুঝি মিটে যেত।
নামাজ শেষে ঈদগাহের চারদিকে দেখতে পেতাম সাদা টুপি মাথায় শুধু মানুষ আর মানুষ-ছুটছেন এলোপাতাড়ি। তৎকালী সময়ে প্রতিটি ঈদের ময়দানের পাশে মেলা বসতো। মেলায় বিভিন্ন ধরনের মন্ডা-মিঠাই ও খেলনা বিক্রি হতো। আর বায়োস্কোব দেখানো হতো। আমরা বন্ধুরা দলবেঁধে মনের আনন্দে বায়োস্কোব দেখতাম।
আমাদের সময় ঈদি বা সালামির ব্যাপক প্রচলন ছিল। এর মাধ্যমে ছোট-বড় সকলের প্রতি স্নেহ, শ্রদ্ধা, মমতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আজকাল কতিপয় মুফতিদের ফতোয়ার কারণে পা ছুয়ে সালাম করে ঈদ সালামি নেওয়ার প্রথা উঠে যাচ্ছে।
আমাদের সময় সালামি নেওয়ার জন্য দুপুরে যোহর নামাজের পর বন্ধুরা দলবেঁধে কেওয়াটখালী কলোনী, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, দীর্ঘিরকান্দা, নিউকলোনী, স্টেশন রোড, নওমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে যেতাম। প্রতিটি বাসায় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন খেতাম ও মুরুব্বিদের পা ছুয়ে সালাম করতাম-বিনিময়ে পেতাম ঈদ সেলামি। এভাবে ২-৩ টি বাসায় খাওয়ার পর পেট ভরে যেত। শেষের দিকে সাধলেও আর খাবার হাতে নিতাম না। শুধু সালাম করে সেলামি নিয়ে খুশি মনে চলে আসতাম। পুরো এলাকা ঘুরাঘুরির পর বিকাল দিকে রেলওয়ে ক্লাবঘরের পেছনে অবস্থিত শিমুল গাছের নীচে শিতল ছায়ায় বসে গুণে দেখতাম কে কত টাকা সেলামি পেলো। আমরা প্রত্যেকেই মোটামুটি ৪-৫ টাকার মত বকশিশ পেতাম। উক্ত টাকা দিয়ে প্রত্যেকে যার যার পছন্দ অনুযায়ী গুলতি, মার্বেল, গাড়ি চালানোর বিয়ারিং, মাছ ধরার ছিপ, আম কাটার জন্য ছোট চাকু, ঘুড়ির নাটাই ইত্যাদি কিনতাম। এসব জিনিস কিনার পর অবশিষ্ট টাকা আগামী ঈদের জন্য মাটির ব্যাংকে জমা রাখতাম।
তৎকালীন সময়ে ঈদ উপলক্ষে ময়মনসিংহ শহর ও এর আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন মাঠে বিকাল দিকে ফুটবল খেলা, ভলিবল খেলা, কবাডি খেলা, দড়ি-টানাটানি খেলাসহ বিভিন্ন খেলা অনুষ্ঠিত হতো। আমরা ছোটরা দলবেঁধে এসব খেলা উপভোগ করা জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যেতাম। খেলাগুলো চলতো সন্ধ্যা ৭ থেকে ৭.৩০ টা পযর্ন্ত। তবে সব খেলা আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। কিন্তু যা দেখতা, তা সুন্দরভাবে উপভোগ করতাম। খেলাগুলো শেষ হওয়ার বন্ধুদের বাসায় চলে যেতাম রেডিও এবং কলের গান শোনার জন্য। গানের তালে তালে আমরাও সুর মিলিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করতাম। এভাবে ফুর্তিফার্তা করে সময় পার করকাম। রাত ৮-৯ টার দিকে বাসায় প্রত্যাগমন করতাম।
সারাদিন এভাবে হইচই করার পর ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। তবু বিছানায় যেতে মন চাইতো না। মনে হতো ঘুমোতে গেলেই তো আনন্দ হাতছাড়া হয়ে যাবে। অবশেষে আব্বার বকাবকিতে বিছানায় যেতো হতো। অবসন্ন শরীর নিয়ে বিছানায় শুলেই ঘুমিয়ে পড়তাম। এভাবেই আমরা শৈশবকালে ঈদ আনন্দ উপভোগ করতাম। এগুলো আজ কেবলই স্মৃতি। মধুর স্মৃতি সেই মনে পড়ে মাঝেমধ্যে। আর খুঁজে ফিরি ঈদের সেই স্বর্গীয় আনন্দ।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized